জাতীয়

এই নিস্তব্ধ শহরে লেবু বিক্রেতার কান্না

পশ্চিম আকাশে দিনের সূর্য ডুবুডুবু করছে লাল আভা ছড়িয়ে আছে মেঘের ফাঁকে। ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত সড়ক  মিরপুর রোড নিস্তব্ধ। এমন সময় সায়েন্স ল্যাবরেটরির ওভারব্রিজ থেকে বলাকা সিনেমা হল হয়ে নীলক্ষেত পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য থাকে। যেন তিল ধারণের জায়গা থাকে না। সেই বিস্তীর্ণ এলাকা  এখন এক বিরাণ ভূমি! এ কোন শহর! আমি কি পথ ভুলে অন্য কোথাও চলে এলাম? নিশ্চিত হওয়ার জন্য সাইনবোর্ডগুলো লক্ষ্য করছিলাম। না। এই সেই আমাদের চিরচেনা সায়েন্সল্যাব; কিন্তু আজ অন্যরূপে দেখছি আমি!

আমার গন্তব্য হচ্ছে শাহবাগ। কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধ সংগ্রহ করবো। গত প্রায় একমাস পর বাসা থেকে বেরিয়েছি। মনে চাইল, আশপাশটা একটু দেখে যাই। আমার পরনে পিপিই ছিল। শাহবাগ থেকে কাঁটাবন, ইডেন কলেজের পাশ দিয়ে আজিমপুর গোরস্থান।  যেখানেই চোখে পড়ল  কয়েকটি লাশবাহী গাড়ি। এ শহরে যেন মৃত্যু থেমে নেই। তবে এখানে যে কেউ করোনায় মারা যাননি বোঝা গেল। কারণ লাশের সঙ্গে প্রিয়জনদের বেদনাবিধূর চেহারা দেখা গেল। আমি সামান্য এগিয়ে ডানে মোড় নিলাম গাউসিয়া মার্কেটের দিকে।

প্রিয়াঙ্কা শপিংমল ক্রস করে সামান্য এগিয়ে যেতেই আমার চোখে পড়ল এক লেবু বিক্রেতা মার্কেটের পিলারে দেহটাকে এলিয়ে দিয়েছেন। এটা দেখে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম।  আমার ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করে কয়েকটি ছবি তুললাম। তিনি স্থির হয়ে আছেন। চোখের পাতাটুকু পর্যন্ত নড়ছে না। প্রায় ১৫ মিনিট কৌতূহলে দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি আড়মোড়া দিয়ে ঘুম থেকে জাগলেন। আসলে ঘুম নয়, ক্লান্তি। হঠাৎ সামনে আমাকে দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত হলেন। পরক্ষণেই তার চোখেমুখে হাসি ফুটে উঠল। যেন বহু প্রত্যাশিত কাউকে পেয়ে গেছেন। যার জন্য সারাদিন অপেক্ষায় থেকে ক্লান্তি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।

আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘লেবু নেবেন স্যার, ভালো লেবু, অনেক রস!’ বলেই প্রমাণ দেওয়ার জন্য হাতে চাকু তুলে নিলেন দ্রুত; কেটে দেখাবেন। আমি বাধা দিলাম। মনে হলো আমার বাধা দেওয়া তার পছন্দ হলো না। জিজ্ঞেস করলাম ‘হালি কতো?’ বললেন, ‘৩০ টাকা বিক্রি করি। সারাদিন বসে আছি, একটা লেবুও বিক্রি করতে পারিনি। আপনি প্রথম কাস্টমার। ২৫ টাকা দেন।’

কথা না বাড়িয়ে পকেট থেকে একশ টাকার একটি নোট বের করে দিয়ে বললাম, ‘এক হালি লেবু দেন।’ তিনি টাকা ফেরত দিতে গিয়ে ভাবনায় পড়ে গেলেন। খুচরা নেই। চেহারাজুড়ে শঙ্কা, যদি লেবু আর না কিনি! বুঝতে পেরে বললাম, ‘ফেরত দিতে হবে না। রেখে দিন।’ এবার তার দু’চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। খুব অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, ‘আশপাশে একজন মানুষও দেখতে পাচ্ছি না! লেবু কে কিনবে?’ তিনি বললেন, ‘ভেবেছিলাম রোজার সময়। লেবুটা চলবে। কিন্তু এখানেও ক্রেতা পাবো না সেটা ভাবিনি। এমন শহর তো কখনো দেখিনি!’

আসার সময় তার হাতে আরো বেশ কিছু টাকা তুলে দিলাম। সংকোচ নিয়েই টাকাটা পকেটে রাখলেন। মনে হলো এর জন্যই হয়তো আমার আজকে বের হওয়াটা অনিবার্য ছিল। লেবু বিক্রেতা সিরাজ মিয়ারা যেন তার সন্তানদের মুখে প্রতিদিন আহার তুলে দিতে পারেন সেটাই প্রত্যাশা।

Show More

Related Articles

Back to top button