নারী ও শিশু

রিকশায় ভাড়া না হওয়ায় চোখে পানি সুমির

তার পরনে জিন্সের প্যান্ট আর গায়ের টি শার্ট গলায় একটি ময়লা গামছা। নারী হওয়ার পরেও এই বেশে রাজশাহী মহানগরীতে রিক্সা চালান সুমি ক্রুস। রিক্সা চালিয়ে যা উপার্জন হতো তা দিয়েই সংসার ভালো ভাবেই কাটছিল সুমির। কিন্তু বেশ কয়েকদিন ধরে ভিন্ন চিত্র।  মহামারী করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সরকারি নির্দেশনা মতো লোকজন খুব একটা ঘরের বাইরে বের হচ্ছে না। তাই গোটা শহরে প্রত্যেকটা রাস্তায় ধুধু মরুভূমি অবস্থা। যাত্রী কোনভাবে পাচ্ছেনা সুমি। এর ফলে জীবন-জীবিকা নিয়ে দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে পড়েছেন সুমি। 

গত সোমবার দুপুরের পর রাজশাহীতে প্রখর রোদ।  তার ভেতরে রিক্সা চালিয়ে আসছিলেন সুমি। আসে মহানগরীর পি এন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় সামনে দাঁড়িয়ে  সুমির সঙ্গে কিছুটা কথোপকথন হয়। 

সুমি বললেন, রিক্সা মালিককে দিতে হবে ২০০ টাকা জমা।কিন্তু দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতে চলল পকেট এ ঢুকেছে মাত্র ১০০ টাকা। সন্ধ্যা নাগাদ আরো ১০০ টাকার  ভাড়া হওয়ার কোন উপায় দেখছি না। গাড়ির মালিককে কি দিব, আর নিজে কি খাব?

 তিনি বলেন, ‘পেটের দায়ে রোগব্যাধির ভয় না করে বের হতে হয়েছে।  কিন্তু রাস্তায় তো লোকজন নাই। ভাড়া হবে কেমন করে? গত তিনদিন ধরে একই রকম অবস্থা।  এভাবে আর কতদিন যাবে কে জানে! আমাদের মত যার ঘরে কেউ নাই তার কি হবে? কে দেখবে! কথাগুলো বলছে তখনই আমি দেখলাম তার চোখে পানি।

চোখের পানি মুছতে মুছতে সুমি জানালেন, আমার অর্থ-সম্পদ বলতে কিছুই নেই। নানা রকম কাজ করে সংসার চালাতে হচ্ছে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে ভারী কাজ আর করতে পারে না। রিক্সার হাতল ধরতে বাধ্য হয়েছি।  আগে রিকশার মালিককে দিতে হতো ৩৫০ টাকা তখন তার ভাড়া হত ৫০০-৬০০ টাকা। রিক্সার মালিককে দেওয়ার পরও তার সংসার খুব ভালো ভাবেই চলে যেত। কিন্তু বর্তমানের কোন ভাইরাসের কারণে বিবেচনা করে মালিক টাকার অংক কমিয়েছেন। কিন্তু সেই মালিকের জমার ২০০ টাকা উঠছে না।

সুমির দেশের বাড়ি নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার পার্বণী গ্রামে। ১৫ বছর আগে তার স্বামী মারা যান। তার কোলের দুই সন্তানকে নিয়ে কিছুদিন বাবার বাড়িতে থাকেন সুমি। বাবা মারা যাওয়ার পর জীবিকার টানে তিনি চলে আসেন রাজশাহীতে। এখন নগরের বাটার মোড় এলাকায় পলিথিন দিয়ে ঘর বানিয়ে থাকেন  তিনি। তেরো বছরের ছোট্ট ছেলেটা থাকে এতিমখানায়। সুমি এখন বয়স প্রায় ৪৮। তিনি রিক্সা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।

সুমিকে রিক্সা টানতে দেখে অনেকেই সাহায্য সহযোগিতা করতে চেয়েছেন। যাত্রী হয়ে আসা এক ব্যক্তি শ্রমিক একটি নতুন রিক্সা কিনে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সবই কোনোভাবেই কারো সাহায্য গ্রহণ  করেননি। সুমি বলেন, কত সাহায্য আসে কোন কিছু নাগাল করতে পারেনি। শহরে কত জায়গায় চাল বিতরণ হয় কিন্তু আমি গেলে আমাকে দেয়না। আমি বলি আমি এতদিন ধরে আছি আমাকে চেনেন । আমাকে নাকি দেওয়া যাবে না। আমাকে কেন দেওয়া যাবে না? আমি কি দেশের মানুষ না? তারপরেও লাভ হয় না।

অসহায় সুমি বিধবা ভাতার কার্ড পাননি। নিজ গ্রামে গিয়েছিলেন ইউনিয়ন পরিষদে বিধবা ভাতার কার্ড পেতে। কিন্তু কেউই তাকে পাত্তা দেয়নি।  তিনি ধরে নিয়েছেন তার সামনে পিছনে আর কেউ নেই। আগে নিজে নিজেই সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হবে নিজের মতো করে। 

সুমির বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা প্রশাসক হামিদুল হক বলেন, এখন তো রাস্তায় মানুষ নেই রিকশায় তো ভাড়া উঠবে না। তাকেই পরিস্থিতিতে আর এস চালানোর দরকার নেই তার কার্যালয়ে  পাঠানো হলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তার খাবারের ব্যবস্থা করে দিবেন।

Show More

Related Articles

Back to top button
Close